Wednesday, April 3, 2019

                                                                    এ্য কমফোর্টেবল চেয়ার

এক.
মিন্টু হন্তদন্ত হয়ে রুমে এসে ঢুকলো।
ভাই ! চেয়ার পাওয়া গেছে!
কি বলিস রে মিন্টু ??
হ্যাঁ ভাই,দারুন একটা চেয়ারের সন্ধান পেয়েছি।
এই দেখুন,বলেই নামকরা কোম্পানির লিফলেটটি এগিয়ে দিলো নেতাভাইকে।চেয়ারটি নেতাভাইয়ের মনে ধরলো।নেতাভাই এইবার নির্বাচনে জিতছেন ,উনার তাই ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।সুতরাং আনন্দে আত্নহারা নেতাভাই মিন্টুকে জড়িয়ে ধরলেন।মিন্টু , নেতাভাইয়ের শরীরে দামী পারফিউমের সুবাস পায়।চোখ বন্ধ করে মিন্টু ভাবে, নেতাভাইয়ের নামটা হলো সরফরাজ আর নির্বাচন জিতে সরফরাজ ভাইয়ের কপালটাই রাজ হয়ে গেছে।
একটু পরেই দলবল নিয়ে নেতাভাই চললেন, চেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে।কালো রংয়ের ব্রান্ডেড গাড়ি থেকে প্রথমে নামলো মিন্টু তারপর গাড়ির দরজা খুলে একপাশে দাড়াঁতেই নেমে আসলেন নেতাভাই।শোরুমে ঢুকা মাত্র, ম্যানেজার সাহেব উঠে এসে নেতাভাইকে সালাম দিয়ে কুশলাদি জানতে চাইলেন।নেতাভাইয়ের হয়ে মিন্টুই মুখ খুললো।ম্যানেজার সাহেব সবকিছু শুনে লজ্জায় জিভ কাটলেন,তারপর নেতাভাইয়ের কাছে বিনীত ভাবে অনুরোধ করলেন,ভাই যেন চেয়ারটা ছোট্ট উপহার হিসেবে গ্রহন করেন। নেতাভাই ম্যানেজার সাহেবের আবদার রাখলেন ,লাখ টাকা মূল্যের এই ছোট্ট উপহার গ্রহন করে।
চেয়ারটা চলে গেলো ভাইয়ের নির্দেশে বাগানবাড়িতে।
মিন্টুর আজ মন ভালো নেই কারন আজকে বৃহঃস্পতিবার।এই দিনে ঘুমানোর উপায় থাকে না।সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই বাগানবাড়িতে চলে আসতে হয় মিন্টুকে।তারপর ভাইয়ের বৈঠকরুম ঠিকঠাক করতে হয়।মিন্টু একে একে সব কাজ শেষ করে।মনে মনে ভাবে আজ বৃহঃস্পতিবার ,একটু পরে শুরু হবে খামভর্তি সুপারিশের লম্বা লাইন।সবশেষে দামী নরম টিস্যু দিয়ে আরো একবার ঝকঝকে করে তোলে নেতাভাইয়ের চেয়ারটাকে।
দুই.
আফরোজা বেগম ,বয়স পঞ্চাশ।রোজ ভোরে ঘুম ভেঙ্গে উঠে নামাজ পড়েন আর কান্নাকাটি করে মোনাজাত ধরেন অনেকক্ষন।মকবুল হোসেন মসজিদ থেকে ফিরে এই কান্নাকাটি রোজ দেখেন কিন্তু এই কান্না কবে,কখন,কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা জিজ্ঞেস করার মত বুকভরা সাহস মকবুল হোসেনের সাতাশে হয়নি আর এখনতো সাতান্নতে হবার কথা নয়।সে যাক,ভেবে কাজ নেই ভেবেই মকবুল হোসেনের দিন শুরু হয় আফরোজা বেগমের হাতের চিনিছাড়া লিকার চায়ে।তিনি খবরের কাগজে চোখ পাতেন।চোখে পড়ে আজকের তারিখটা।আজ তার বড়ছেলের চাকুরীর ফলাফল বের হবার কথা।
মনে পড়ে যায়, ব্যাংকের বড়কর্তার লাইন পেতে অনেক বেগ পেতে হয়ে ছিলো তাকে, তার উপর ঘুষের অতগুলো টাকার জোগাড় করাটাও কঠিন ছিল...
কাকের কর্কশ ডাকে ছেদ পড়ে ভাবনায় তার।এরপর আবার ভাবেন ,আহা বড়কর্তা! কি অমায়িক মানুষ তবে ...... না থাক! অতো ভেবে কাজ নেই সবুরে মেওয়া ফলে।তবে বড়কর্তার চেয়ারটা খুব আকর্ষনীয়,কত দামী !আবারো ভাবনায় হারান অবসরপ্রাপ্ত মকবুল হোসেন...
তিন.
দুপুরের কড়া রোদ বাইরে খাঁ খাঁ করছে ।অফিসের দোতলায় সাজানো গুছানো এসি রুমে বসে চা-নাস্তা করছেন কয়েকজন গণ্ কর্তাবৃন্দ।চলছে মিটিংয়ের ব্রেক।একই অফিসের নিচতলায় বসে ঘাম ঝরছে কবির সাহেবের।মনে মনে কপালকে দোষারুপ করছেন আর ভাবছেন একই বিল্ডিংয়ের দোতলায় কত আরাম আর নিচতলায় ৫/৬ জন মানুষ একটা রুমে,সাথে এতো ফাইলপত্র,অনেক কাজ,চলছে একটা মাত্র ঘটর ঘটর আওয়াজের ফ্যান। বড়স্যার কি চাইলে একটা এসি দিতে পারতেন না তাদের ? কবির সাহেবের মনে পড়ে ,এই তো সেদিন নতুন বড়স্যারকে অফিসে জয়েন উপলক্ষ্যে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানালেন সবাই আর কেমন করে একটা সপ্তাহের ব্যবধানে পাল্টে গেল বড়স্যারের রুমের কার্পেট থেকে শুরু করে ফ্লাওয়ার ভেইসটা পর্যন্ত ।বদলে গেলো চামচাদের কপাল।শুধু গাধার খাটনিওয়ালা কর্মঠ লোকগুলো যেমন ছিলো তেমন রয়ে গেলো ।ছাপোষা কবির সাহেব আর বড়স্যারের মাঝে অনেক অনেক পার্থক্য ।এর মধ্যে প্রথমটা হলো, বছরে একবার গাড়ি পাল্টান বড়স্যার আর কবির সাহেব বছরে প্রতিদিন দুইটা বাসের জীর্নশীর্ন সীট পালটান সকাল বিকেল। আরেকটা পার্থক্য হলো কবির সাহেবের চেয়ে বড়স্যার বয়সে ছোট হবেন তবে তার চেয়ারটার ওজন ঢের ।
লেখাঃ দেওয়ান তানিয়া ওদুদ

0 comments:

Post a Comment