জীবন একেক জনের কাছে একেক সংজ্ঞায় ধরা দেয় । কারো কাছে যুদ্ধ জয়ের পর বিজয়ী রাজার মাথায় পরা মুকুটের মত পরম আকাঙ্ক্ষার,কারো কাছে শুধু নিথর দেহে,নিরস প্রাণে,পড়ে থাকা ঝরা পাতার মত।কারো কাছে জীবন তরুপের তাস হয়েও ধরা দেয় ।
![]() |
হিউ হের |
হ্যাঁ আজ এমন একজনের গল্প শুনাবো যিনি জীবনকে নিয়ে সত্যিই এক রোমাঞ্চকর খেলায় মেতে ছিলেন এবং মেতে আছেন ।সত্যিই একজন হার না মানা মানুষ তিনি। নাম তার হিউ হের ।তিনি ২৫ অক্টোবর ১৯৬৪ সালে ল্যানচেস্টার,পেনসিলভানিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন ।তিনি ছিলেন একজন পর্বতারোহী ।তাঁর বয়স যখন আট তিনি কানাডা রকিসের মাউন্ট টেম্পলে আরোহণ করেন,যার উচ্চতা ১১৬২৭ ফুট ।
মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি আমেরিকার সেরা আরোহীর তকমা লাভ করেন ।এরপর জানুয়ারি ১৯৮২ সালে মাউন্ট উয়াশিংটনের হান্টিংটন উপত্যকায় একটি কঠিন আইস রুটে আরোহণ করতে চান কিন্তু বিধি বাম কারণ সেই রুটে আরোহণের সময় তিনি এবং তাঁর সহ-আরোহী জেফ বাটজার প্রবল তুষারঝড়ের কবলে পড়েন এবং তারপরই তারা গ্রেট গালফের পথে পিছু হাঁটেন এবং সেই সময় -২৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সেখানে তিন রাত যাপন করতে হয় তাদের।যদিও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সেই সময় তাদেরকে উদ্ধার করা হয় এবং তারা প্রাণে বেঁচে যান কিন্তু পরবর্তীতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন ফ্রস্টবাইটে ।ফ্রস্টবাইটে হেরের দুটো পায়ের হাঁটুর নিচ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার দ্বারা কেটে ফেলতে হয় এবং তার সহ-আরোহী হারান বাম পায়ের নিচের অংশ ও ডান পায়ের আঙ্গুল এবং ডান হাতের আঙ্গুল ।তাছাড়া ঐ উদ্ধার অভিযানের সময় আলবার্ট ডো নামে একজন ভলান্টিয়ার বরফ ধ্বসে প্রাণ হারান।
আরোহনরত
এই দুর্ঘটনার পর কয়েকমাস তিনি চিকিৎসাধীন থাকার পরে তার চিকিৎসক তাকে যা বলেন তা রীতিমত অকল্পনীয় । ডাক্তার হেরকে আবার ও পর্বত আরোহণের জন্য পরামর্শ দেন এবং হেরও ঠিক তাই করেন । তিনি বিশেষ ধরনের নকল পায়ের সাহায্যে আরোহণে এতোটা উন্নতি করেন যা কি না তার দুর্ঘটনার আগের সময়ের চেয়ে ও অনেক সফলতা এনে দেয় জীবনে । তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ এবং শারীরিকভাবে সামর্থ্য-সম্পন্ন প্রতিযোগীদের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন ।
তার ক্লাইমবিং ক্যারিয়ারের পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি দেন।তিনি পদার্থবিজ্ঞানের উপর স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন এবং পরে মাস্যাচুসেট্স ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োফিজিক্সে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন ।
হের যখন এমআইটিতে বায়োমেডিক্যাল ডিভাইস বিষয়ে একজন ফেলো ছিলেন সেই সময় তিনি উন্নত নকল পা এবং অর্থোসিস নিয়ে কাজ করতেন এবং এমন একটি ডিভাইস নিয়ে কাজ শুরু করেন যা কিনা মানুষের পায়ের কার্যকারিতা অনুকরণ করবে । বর্তমানে হের এমআইটিতে প্রোগ্রাম ইন মিডিয়া আর্টস এন্ড সাইন্স ও
হার্ভার্ড-এমআইটি ডিভিশন অফ হেলথ্ সাইন্স এন্ড টেকনোলজিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে আছেন ।এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের বায়োমেকাট্রোনিক্স রিসার্চ গ্রুপের তিনিই প্রধান এবং সেই সময় তার লক্ষ্য স্থির হয় পরিধানযোগ্য রবোটিক সিস্টেমস এর প্রতি যা মানুষের শারীরিক সার্মথ্যতা বৃদ্ধি করবে ।তিনি যেসব ডিজাইন করেছিলেন অধিকাংশ ডিজাইনই তার নিজের জন্য নয় কিন্তু যাতে অন্যরা অসুবিধায় না পড়ে এটাই ছিল তার মূল লক্ষ্য ।
![]() |
| এমআইটি মিডিয়া ল্যাব h2.0 সিম্পোজিয়াম |
তার রয়েছে অসংখ্য খেতাব ও পুরস্কার। হের কর্তৃক উদ্ভাবিত কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত নকল হাঁটু যার নাম দেয়া হয় রেয়া (Rheo) এবং রেয়া (Rheo) টাইম ম্যাগাজিন ২০০৪-এ টপ টেন লিস্টে স্থান পায় এবং তাঁর আরও একটি উদ্ভাবন নাম হলও বায়োএম (BiOM) এটি গোড়ালি ও পা এর শক্তি-প্রদত্ত একটি নকল পা এবং এই উদ্ভাবনটিও ২০০৭ সালে আবারও টাইম ম্যাগাজিনের টপ টেনে জায়গা করে নেয় ।হের এমন এক বায়োনিক অঙ্গ তৈরি করেন যা মানুষের শরীরের অন্যান্য অঙ্গের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে ।
![]() |
| হের তাঁর উদ্ভাবন প্রদর্শন করছেন |
২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে "লিডার অফ বায়োনিক এইজ" আখ্যা দেয়া হয় কারন তিনি এমন এক বৈপ্লবিক কাজ করেন যা বায়োমেকাট্রনিকস টেকনোলজিতে হিউম্যান ফিজিওলজি এবং ইলেকট্রোমেকানিক্সকে এক অসাধারণ সূত্রে যুক্ত করে ।
বায়োনিক অঙ্গ নিয়ে সফলতা বয়ে এনে তিনি যে যুগান্তকারী অগ্রগতি দেখিয়েছেন তার ফলাফল ভোগ করবে শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষগুলো।
হেরের নিজস্ব একটি কোম্পানি আছে সেই কোম্পানির তিনিই প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনিই চিফ টেকনোলজি অফিসার ।তাঁর কোম্পানি থেকে তারই উদ্ভাবন "BiOM" বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রয় করা হয় ।ক্লিনিক্যালি দেখানো হয়েছে ইতিহাসের প্রথম BiOM দ্বারা মানুষ স্বাভাবিক ভাবে সঠিক গতি বজায় রেখে চলাফেরা করতে পারছে ।
তাছাড়া নিজস্ব উদ্ভাবনের উপর ১৫০টির ও বেশি লেখার রচয়িতা তিনি ।তাঁর লেখায় বায়োমেকানিক্স এবং বায়োলজিক্যাল মোশন কন্ট্রোল বিষয়ের আলোকে প্রযুক্তির উদ্ভাবনের সাহায্যে মানুষের শারীরিক ক্ষমতার পুনর্বাসন ও প্রবর্ধনের কথা প্রকাশ পায় ।
হের তার যুগান্তকারী উদ্ভাবন কাজের দ্বারা অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন।তিনি ১৩তম এনুয়্যাল হেইঞ্জ এওয়ার্ড ফর টেকনোলজি,দ্য ইকোনমি এন্ড এমপ্লয়মেন্ট,দ্য প্রিন্স সালমান এওয়ার্ড ফর ডিজেবিলিটি রিসার্চ ,দ্য স্মিথসোনিয়ান আমেরিকান ইনজেনুয়িটি এওয়ার্ড ইন টেকনোলজি ,১৪তম ইনোভেটর অফ দ্য ইয়ার এওয়ার্ড,৪১তম ইনভেনটর অফ দ্য ইয়ার এওয়ার্ড সহ আরও অনেক পুরস্কার লাভ করেন ।তাছাড়া হিউ হেরের গল্প নিয়ে তৈরি
"এসেন্ট:দ্য স্টোরি অফ হিউ হার "
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে প্রকাশ পায় ।
হেরের স্মরনীয় রক ক্লাইমবিং
· ১৯৮৩ সালে ভেনডালস,গুনক্সে ।সহআরোহী লিন ও ক্লুন ,প্রথম ৫.১৩ ইস্ট কোয়াস্ট ।
· ১৯৮৪ সালে স্টেইজ ফ্রেইট (৫.১২সি এক্স),ক্যাথাড্রেইল লেইজ ,নর্থ কনওয়ে-ফার্স্ট এসেন্ট ।
· ১৯৮৬ সালে রাইড অফ দ্য ভালক্যারেস (৫.১২এ),ক্যারিনো ক্রেগ,লিভেনওর্দ -ফার্স্ট এসেন্ট ।
·
১৯৮৬ সালে সিটি পার্ক (৫.১৩সি),ইনডেক্স টাউন উয়ালস্ -২য় এসেন্ট ।
হেরের ব্যক্তিগত জীবন
তার সহধর্মিণী লেখিকা প্যাট্রিসিয়া এলিস হের ।এবং তাদের রয়েছে দুটো কন্যাসন্তান ।নাম আলেকজান্দ্রা আর সেইজ।
তথ্যসূত্র
Writer : Dewan Tania Wodud












0 comments:
Post a Comment